প্যারাসিটামল কীভাবে তৈরি হয়? উপাদান, কাঁচামাল ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া

প্যারাসিটামলঃ একটি সাধারণ ওষুধের ভেতরের অসাধারণ গল্প

আমরা প্রায় সবাই জীবনে কোনো না কোনো সময় প্যারাসিটামল খেয়েছি। জ্বর হলে, মাথাব্যথা করলে, শরীর ব্যথা করলে—ডাক্তারের মুখে প্রথম যে নামটি শোনা যায়, সেটি হলো প্যারাসিটামল। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই ছোট্ট সাদা ট্যাবলেটটি আসলে কী দিয়ে তৈরি? কোথা থেকে আসে এর কাঁচামাল, আর কীভাবে এটি কারখানায় ধাপে ধাপে প্রস্তুত হয়?

আজ সেই অজানা গল্পটাই আপনাকে সহজ ভাষায় বলবো।

প্যারাসিটামল কীভাবে তৈরি হয়? উপাদান, কাঁচামাল ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া
চলুন এই নিবন্ধে আমরা জেনে নিই, প্যারাসিটামল কীভাবে তৈরি হয়? উপাদান, কাঁচামাল ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত।

প্যারাসিটামল আসলে কী?

প্যারাসিটামল (Paracetamol), যাকে অনেক দেশে Acetaminophen নামেও ডাকা হয়, একটি ব্যথানাশক ও জ্বরনাশক ওষুধ। এটি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে কাজ করে শরীরের তাপমাত্রা কমায় এবং ব্যথার অনুভূতি হ্রাস করে। তবে এটি অ্যান্টিবায়োটিক নয় এবং প্রদাহ (inflammation) কমানোর কাজও খুব বেশি করে না।

প্যারাসিটামলের রাসায়নিক গঠনঃ

প্যারাসিটামলের রাসায়নিক নাম N-acetyl-para-aminophenol। এটি একটি অর্গানিক যৌগ যা ব্যথা এবং জ্বর নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনস (Prostaglandins) উৎপাদন বন্ধ করে। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনস এমন একটি রাসায়নিক যা ব্যথা এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে।

প্যারাসিটামলের মূল উপাদান (Active Ingredient)

প্যারাসিটামল প্রস্তুতির জন্য কয়েকটি প্রধান রাসায়নিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ

১। প্যারাএমিনোফেনল (Para-aminophenol): এটি প্যারাসিটামলের প্রধান কাঁচামাল।

২। অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড (Acetic Anhydride): এটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্যারাএমিনোফেনলকে প্যারাসিটামলে রূপান্তরিত করে।

প্যারাসিটামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো-

✔ Paracetamol / Acetaminophen (API – Active Pharmaceutical Ingredient)

এছাড়াও ট্যাবলেট বানাতে কিছু সহায়ক উপাদান লাগে, যেগুলোকে বলা হয় Excipients

সহায়ক উপাদানগুলো হলোঃ

  • স্টার্চ (ট্যাবলেট শক্ত করতে)

  • মাইক্রোক্রিস্টালাইন সেলুলোজ

  • ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট

  • ট্যালকম পাউডার

এগুলো শরীরে কাজ করে না, তবে ওষুধকে সুন্দরভাবে তৈরি করতে সাহায্য করে।

কাঁচামাল কোথা থেকে আসে?

১। প্যারাএমিনোফেনলঃ (Para-aminophenol) এটি মূলত কয়লা-তার উৎপন্ন রাসায়নিক যৌগ, যা পেট্রোকেমিক্যাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যেমন চীন, ভারত, এবং জার্মানি, প্যারাএমিনোফেনলের বড় উৎপাদক।

২। অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডঃ (Acetic Anhydride) এই উপাদানটি প্রধানত প্রাকৃতিক গ্যাস বা পেট্রোলিয়াম থেকে প্রাপ্ত।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, এবং ইউরোপীয় দেশগুলো অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের বড় সরবরাহকারী।

প্যারাসিটামল তৈরির প্রক্রিয়াঃ

প্যারাসিটামল তৈরির সাধারণ ধাপগুলো হলোঃ

১। প্রাথমিক প্রক্রিয়াঃ প্যারাএমিনোফেনলকে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের সাথে মিশিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া করানো হয়।

২। বিক্রিয়ার ফলাফলঃ এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্যারাসিটামল এবং সাইড প্রোডাক্ট (যেমন পানি) তৈরি হয়।

৩। পরিশোধন (Purification) উৎপন্ন প্যারাসিটামলকে পরিশোধন করে ক্রিস্টাল আকারে রূপান্তরিত করা হয়।

৪। ট্যাবলেট বা সাসপেনশনঃ পরিশোধিত পাউডারকে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, বা সিরাপ আকারে প্রস্তুত করা হয়।

কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও বাংলাদেশে প্যারাসিটামল উৎপাদন

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো আমদানিকৃত প্যারাএমিনোফেনল এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে প্যারাসিটামল উৎপাদন করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে, স্থানীয় পর্যায়ে উপকরণের উৎপাদন ব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশগত প্রভাবঃ

প্যারাসিটামল উৎপাদনের সময় সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাসায়নিক বর্জ্য পরিবেশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

কেন প্যারাসিটামল এত জনপ্রিয়?

কারণ এটি-

  • দ্রুত কাজ করে

  • শিশু ও বয়স্কদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ

  • সঠিক মাত্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম

  • সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী

প্যারাসিটামল কি নিরাপদ?

সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করলে প্যারাসিটামল সাধারণত নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন বা বেশি ডোজে ব্যবহার করা উচিত নয়।

উপসংহারঃ

প্যারাসিটামল একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ যা বিশ্বব্যাপী রোগী যত্নে ব্যবহৃত হয়। এর উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং কাঁচামাল সরবরাহ একটি জটিল ও বৈশ্বিক চেইনের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

[আপনি চাইলে এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করতে পারেন] 

কীভাবে এই আর্টিকেলটি আরও উন্নত করা যায় সে সম্পর্কে আপনার কোনো পরামর্শ থাকলে দয়া করে জানাবেন। 

আপনি যদি আরও এই ধরনের গাইড, টিপস বা টিউটোরিয়াল পড়তে চান, তাহলে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের সাইটে  https://www.baneswarit.com/ এবং আমাদের ফেসবুক পেজ ভিজিট করুনঃ https://www.facebook.com/profile.php?id=61577238192159

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url