জানাজার নামাজের নিয়ম ও ফজিলত | জানাজার নামাজ কেন ও কীভাবে আদায় করবেন

জানাজার নামাজের নিয়ম ও ফজিলত | জানাজার নামাজ কেন ও কীভাবে আদায় করবেন।

জানাজার নামাজ মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এটি মৃত মুসলিম ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম এবং ইসলামের শিষ্টাচার ও মানবিকতার প্রকাশ। জানাজার নামাজের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করা হয়। এই ইবাদতের মধ্যে রয়েছে ইসলামের গভীর দিকনির্দেশনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা।

জানাজার নামাজের নিয়ম ও ফজিলত | জানাজার নামাজ কেন ও কীভাবে আদায় করবেন

চলুন এই আর্টিকেলে আমরা জেনে নিই, জানাজার নামাজের নিয়ম ও ফজিলত | জানাজার নামাজ কেন ও কীভাবে আদায় করবেন বিস্তারিত সম্পর্কে।

জানাজার নামাজ কী এবং কেন আদায় করা হয়?

জানাজার নামাজ হলো মৃত মুসলমানের জন্য দোয়া করার বিশেষ নামাজ। এটি ফরজে কিফায়া—অর্থাৎ কিছু মুসলমান আদায় করলে বাকিদের ওপর দায় থাকে না। কিন্তু যদি কেউই আদায় না করে, তাহলে সবাই গুনাহগার হয়।

এই নামাজে রুকু, সিজদা নেই। এখানে মূল কাজ হলো—মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা। যা মৃত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।

এই নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে আবেদন করি—

  • হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করে দিন

  • তার কবরকে প্রশস্ত করুন

  • তার গুনাহ মাফ করে দিন

জানাজার নামাজের গুরুত্বঃ

জানাজার নামাজ একজন মুসলিমের জীবনের শেষ সময়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া করার ব্যবস্থা। এটি মুসলিম সমাজের ঐক্য ও সহযোগিতার প্রতীক। 

হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেনঃ

"যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ আদায় করবে তার জন্য এক কীরাত, আর যে কবর পর্যন্ত যাবে তার জন্য দুই কীরাত সওয়াব। এক কীরাত হলো উহুদ পর্বতের সমান।"

(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

জানাজার নামাজের নিয়মঃ

জানাজার নামাজের জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন রয়েছে। এগুলো হলোঃ

১। নিয়তঃ

জানাজার নামাজের শুরুতে নিয়ত করা জরুরি। নিয়ত করতে হয় মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে। নিয়ত মনে মনে করা হয়, মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়।

নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়। তাই মনে মনে এভাবে নিয়ত করলেই যথেষ্ট—

“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায় করছি এবং তার জন্য দোয়া করছি।”

২। তাকবিরঃ

জানাজার নামাজ চার তাকবিরে আদায় হয়।

১) প্রথম তাকবিরঃ তাকবির বলে হাত উঠিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এরপর সুরা ফাতিহা পড়তে হবে।

২) দ্বিতীয় তাকবিরঃ দ্বিতীয় তাকবিরের পর দুরুদ (যেমন: দরুদে ইব্রাহিম) পড়তে হবে।

৩) তৃতীয় তাকবিরঃ তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হয়। 

দোয়ার উদাহরণঃ

"আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়িনা ওয়া মাইয়িতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া সগিরিনা ওয়া কবিরিনা ওয়া জাকরিনা ওয়া উন্সানা..."

৪) চতুর্থ তাকবিরঃ চতুর্থ তাকবিরের পর আল্লাহর কাছে মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত প্রার্থনা করা হয়।

৩। সালামঃ

চতুর্থ তাকবিরের পরে ডান ও বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।

জানাজার নামাজের শর্তসমূহ

জানাজার নামাজ আদায়ের জন্য কয়েকটি শর্ত অবশ্যই পূরণ হতে হয়—

  • মৃত ব্যক্তি মুসলমান হতে হবে

  • জানাজার নামাজ আদায়কারী ও স্থান পাক-পবিত্র থাকতে হবে

  • কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে

  • মৃতের দেহ সামনে উপস্থিত থাকতে হবে

  • সতর ঢাকা থাকতে হবে

জানাজার নামাজের দোয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই নামাজে মৃত ব্যক্তি নিজে আর কোনো আমল করতে পারে না। জীবিত মুসলমানদের দোয়াই তার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়। হাদিসে এসেছে—
মুসলমানদের সম্মিলিত দোয়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

আরো পড়ুনঃ 

জানাজার নামাজের ফজিলত (সওয়াবের বিশালতা)

রাসূল (সাঃ) বলেছেন—

“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পড়ে, সে এক কিরাত সওয়াব পায়। আর কবর পর্যন্ত গেলে দুই কিরাতসওয়াব পায়।”

এক কিরাত মানে পাহাড়সম সওয়াব।

জানাজার নামাজের বিশেষ ফজিলত

  • গুনাহ মাফের সুযোগ

  • ফেরেশতাদের আমিন

  • নিজের মৃত্যু স্মরণ

  • অহংকার ভেঙে যায়

  • অন্তর নরম হয়

১। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়াঃ জানাজার নামাজে অংশগ্রহণকারীরা মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও জান্নাতের দোয়া করেন, যা তাকে আখিরাতে উপকৃত করে।

২। সওয়াব অর্জনঃ যারা জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করেন, তাদের জন্য বিশাল সওয়াবের ঘোষণা রয়েছে।

৩। সমাজে ঐক্য ও মানবিকতা বৃদ্ধিঃ জানাজার নামাজ মুসলিম সমাজের ঐক্য ও মানবিকতাকে জাগ্রত করে।

৪। কবরস্থানে যাওয়ার তাগিদঃ কবরস্থানে যাওয়ার মাধ্যমে মৃত্যু স্মরণ হয়, যা মানুষের অন্তরকে নরম করে এবং আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা বাড়ায়।

জানাজার নামাজ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

এই নামাজ আমাদের শেখায়—

  • দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী

  • ক্ষমা ও দোয়া সবচেয়ে বড় উপহার

  • আজ যে বিদায় নিচ্ছে, কাল আমিও নেব

জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে—আসল সফলতা অর্থে নয়, আমলে।

জানাজার নামাজ নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন

প্রশ্নঃ জানাজার নামাজ মসজিদে পড়া যাবে?

উত্তরঃ হ্যাঁ, পড়া যায়। খোলা মাঠ বা মসজিদ—উভয়ই বৈধ।

প্রশ্নঃ জানাজার নামাজে জামাত জরুরি?

উত্তরঃ জামাতে পড়া উত্তম, তবে একা পড়লেও আদায় হয়।

প্রশ্নঃ জানাজার নামাজে সূরা ফাতিহা পড়তে হয়?

উত্তরঃ হানাফি মতে সানা পড়া হয়। সূরা ফাতিহা নয়।

প্রশ্নঃ শিশু মারা গেলে জানাজা হবে?

উত্তরঃ হ্যাঁ, মুসলমান শিশুর জানাজার নামাজ হয়।

প্রশ্নঃ জানাজার নামাজ না পড়লে কি গুনাহ?

উত্তরঃ হ্যাঁ, যদি কেউই আদায় না করে, সবাই গুনাহগার হয়।

প্রশ্নঃ জানাজার নামাজ কত সময় লাগে?

সাধারণত ৩–৫ মিনিট।

উপসংহারঃ

জানাজার নামাজ একজন মুসলিমের প্রতি জীবনের শেষ সময়ে দেওয়া সম্মান ও দোয়ার বহিঃপ্রকাশ। এটি শুধু মৃত ব্যক্তির জন্যই নয়, জীবিতদের জন্যও আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার শিক্ষা। তাই, প্রত্যেক মুসলিমের উচিত জানাজার নামাজের নিয়ম ভালোভাবে জানা এবং এর ফজিলত অনুধাবন করে তা গুরুত্বসহকারে আদায় করা।

জানাজার নামাজ খুব ছোট। কিন্তু এই ছোট নামাজটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয়। চার তাকবিরের এই নামাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়

একদিন মানুষ তোমার নাম ধরে ডাকবে না, ডাকবে—“চল, জানাজা পড়ি।”

সেদিন যেন আমাদের জন্য দোয়া করার মতো কিছু থাকে। সময় থাকতে ভালো কাজ করুন, দোয়া করুন, মানুষ হয়ে বাঁচুন। 

[আপনি চাইলে এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করতে পারেন] 

কীভাবে এই আর্টিকেলটি আরও উন্নত করা যায় সে সম্পর্কে আপনার কোনো পরামর্শ থাকলে দয়া করে জানাবেন। 

আপনি যদি আরও এই ধরনের গাইড, টিপস বা টিউটোরিয়াল পড়তে চান, তাহলে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের সাইটে  https://www.baneswarit.com/ এবং আমাদের ফেসবুক পেজ ভিজিট করুনঃ https://www.facebook.com/profile.php?id=61577238192159

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url